গণতন্ত্র-ওয়েবসভা ২: সংবিধান, আইন ও 'নারী'
সংবিধান, আইন ও ‘নারী’
নাদিয়া ইসলাম
ভূমিকা
২০২৪ সালের জুলাই অগাস্ট মাস।
এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়ে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিচারব্যবস্থা প্রশাসন ধ্বংস করা, ওপর দিয়ে উন্নয়নের লাল-নীল বাতির তলদেশের তাসের ঘরের ফাঁকা বুলি আওড়ানোর, স্বজনপ্রীতির, চুরি-বাটপারি-লুটপাট-গুম-খুনের দেড় যুগের জুলুমবাজির, আয়নাঘরের স্বৈরশাসনের ত্রাসের রাজত্ব। বাংলাদেশ এসে দাঁড়ায় এক অস্থির রাজনৈতিক পথের বাঁকে। মানবাধিকারের পুনঃরুদ্ধার আর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক বিনির্মাণই এই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা হলেও দেড় যুগের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের সাথে সাথেই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ক্রিয়ারত আইন-শৃংখলা বাহিনীরও চূড়ান্ত পতন ঘটে। সারাদেশে নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির সুযোগে নানারকম সুযোগ-সন্ধানী দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক-জাতিগত-ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর আস্ফালন শুরু হয়ে যায়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায় ও পাহাড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠী, ভিন্ন তরিকার ও পন্থার মানুষ আক্রান্ত হয়। এবং একই সাথে জাতীয় জীবনে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রসঙ্গ আমাদের আলোচনার সামনে চলে আসে।
এই আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশা-ধর্মের নারীর স্বতস্ফূর্ত নেতৃত্ব, অংশগ্রহণ, ত্যাগ এবং রক্ত ছিলো। সেই কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান—সবক্ষেত্রে নারীরা সমান তালে অংশ নিয়েছেন। ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনীর হাতে ঢাকার রাস্তায় বেধড়ক মার খেয়ে রক্তাক্ত হওয়া, তারপরে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীহলগুলো থেকে ছাত্রীদের একযোগে নেমে পড়া, ছাত্রলীগকে হল ও ক্যাম্পাসগুলো থেকে অবাঞ্ছিত করা থেকে শুরু করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে, সারাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, সমন্বয়কদের কমিটিতে, সর্বত্র নারীর সরব উপস্থিতি ছিলো। তারা মার খেয়েছেন, গুলি খেয়েছেন, আহত হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। পুলিশ ভ্যানের সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়েছেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, রাস্তাঘাট-আবর্জনা পরিস্কার, মন্দির পাহারার কাজে যুক্ত থেকেছেন। তখন নারীর পোশাক নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। মিছিলে, মিটিং-এ, পুলিশের আক্রমণ মোকাবেলায় পুরুষ আন্দোলনকারীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে কোনো সমস্যা হয়নি, দিনে ও রাতে নারীর সরব উপস্থিতিতে কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু আন্দোলন পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি খুব সচেতনভাবে লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী কায়দায় আন্দোলনের ইতিহাস থেকে নারীদের ছবি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। নারীর ওপরে আক্রমণও শানানো হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারীর পোশাক-আশাক ও স্বাধীন চলাফেরায় হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত প্রান্তিক মানুষের মত নারীও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এমনকি, যেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে নারী এমন লড়াই করলেন, সেই রাষ্ট্র সংস্কারের কাজেও নারীকে অপরায়ণের প্রচেষ্টা বিদ্যমান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার উদ্দেশ্যে যেসব কমিশন তৈরি করেছে, সেখানে নারীর উপস্থিতি আনুপাতিক হারে খুবই কম বা নাই বললেই চলে, সবগুলি কমিশনের প্রধানই বেশিরভাগক্ষেত্রে পুরুষ১।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো চরম অগণতান্ত্রিক। বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিলো তা সাংবিধানিক উপায়েই হয়েছিলো, অর্থাৎ ১৯৭২ সালে রচিত ও ১৭ বার সংশোধিত সংবিধানটি বস্তুতঃ ফ্যাসিবাদকেই অনুমোদন করে। সে কারণেই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই সংবিধান সংস্কারের আবশ্যক হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই সংবিধান সংস্কারের জন্যে একটি কমিশন গঠিত হয়েছে, সেই কমিশন কাজও শুরু করে দিয়েছে। আবার, আমাদের সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরতে পরতে পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য বিরাজমান। আমাদের এই লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলই রাজনৈতিক পরিসরে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। সে জায়গা থেকেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোতে লৈঙ্গিক আধিপত্য দূর করা দরকার। সুতরাং, সংবিধান সংস্কারের এই কাজে নারীকে যুক্ত করা দরকার, দরকার নারীর বক্তব্য শোনার।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান২
বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ১৯ অনুযায়ী, “(১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন৷ .. (৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।” ২৭ বলছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”। ধারা ২৮(১) বলছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না”। এবং, ২৮(২) ধারায় নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের অঙ্গীকার করা হয়েছে, “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন”। ধারা ৩২ এ প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার-রক্ষণে জোর দেওয়া হয়েছে, বলা হয়েছে, “আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না”— আমাদের সংবিধানের এই ধারাসমূহ আপাত অর্থে ইতিবাচক, কিন্তু বাস্তবে নারী জীবনে এসবের প্রয়োগ খুবই সামান্য। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাংলাদেশের নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর এতো যোজন যোজন পার্থক্যের কারণ কী? আমাদের সংবিধানের মৌলিক সমস্যাগুলি কোথায়?
(১) নারী অধিকারঃ আমাদের সংবিধানে নারীর সমানাধিকার ও বৈষম্য দূরীকরণ সম্পর্কিত ধারাগুলো হচ্ছে, ধারা ১৯ (সুযোগের সমতা), ধারা ২৮ (ধর্ম, প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) ও ধারা ২৯ (সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা), ধারাগুলোর কোনটির শিরোনামে “নারী” শব্দটি নাই। সংবিধানে “নারী অধিকার” শীর্ষক আলাদা কোন ধারা নাই। ফলতঃ আমাদের সংবিধানে নারীর সকল মানবাধিকারের স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তাও নাই। ২৮ নাম্বার ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র নারী ও পুরুষভেদে কোন বৈষম্য না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারী ও পুরুষের যে আকাশসম বৈষম্য রয়েছে, তা দূরীকরণে রাষ্ট্রের কোন অঙ্গীকার এই সংবিধানে নাই। ধারা ২৯ বলছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।” অর্থাৎ কেবল সরকারী চাকরিতে তথা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরে সংবিধান অঙ্গীকার করছে, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্য সকল কর্মক্ষেত্রেই নিয়োগ, পদোন্নতি ও মজুরি লাভের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাওয়া যে নারীর অধিকার, সে স্বীকৃতি এই সংবিধানে নাই। নারীর প্রতি যেকোনো নিপীড়ন ও সহিংসতা বন্ধে সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেয়া হয়নি। নারীর গর্ভকালীন ও মাতৃত্বকলীন সুরক্ষা ও সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি, বাল্যবিবাহ ও শিশু-গর্ভাবস্থা থেকে নারীকে রক্ষা করার অঙ্গীকার এই সংবিধানের নাই। এছাড়া, নারীর মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ মানার বাধ্যবাধকতাও সংবিধান রাষ্ট্রকে প্রদান করেনি।
(২) মৌলিক অধিকার আদায়ে বাধ্যবাধকতাঃ আমাদের সংবিধানের তৃতীয়ভাগে বর্ণিত নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে যা যা স্বীকৃত, সেগুলোর অধিকাংশই শর্তের শৃংখলে বাধা! তা আদায়ের বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের ওপরে দেয়া হয়নি। ধারা ৪৪ (মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ) অনুযায়ী নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলবৎ করতে হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা রুজু করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, কিন্তু তা পুরোপুরি নির্ভর করছে নাগরিকের মামলা রুজু করা বা না করার ওপরে। কিন্তু এমন কোন সাংবিধানিক আদালতের কথা নেই, যেটি নিজেই সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে আইনসভার যেকোন আইন, নীতিমালা, বিধান, কিংবা নির্বাহী বিভাগের পরিপত্র সংবিধানের মৌলিক ভাগের (১ম, ২য় ও ৩য় ভাগ) পরিপন্থী কি না তা যাচাই বাছাই করতে। অন্যদিকে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে থাকা রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতি অংশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে যা যা কিছু বলা হয়েছে, তার কোনটির জন্যে আদালতের কাছেও যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এই ভাগেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে আসা হয়েছে, যেগুলো ৩য় ভাগ বা মৌলিক অধিকার অংশ জায়গা পায়নি।
(৩) বিশেষ বিধানঃ ধারা ২৮(৪) বলছে: “নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।” অর্থাৎ এর মাধ্যমে বোঝায় যে, নারীর (এবং শিশুর ও সমাজের অনগ্রসর অংশের) অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান (এফারমেটিভ একশন) তৈরি করা রাষ্ট্রের জন্য কোন দায়িত্ব নয়, বরং বিষয়টি সরকারের মর্জি বা সদিচ্ছার উপর নির্ভর করবে।
(৪) জাতীয় সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসনঃ ধারা ৬৫ (সংসদ প্রতিষ্ঠা) বলছে, “পঞ্চাশটি আসন কেবল মহিলা-সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাঁহারা আইনানুযায়ী পূর্বোক্ত সদস্যদের দ্বারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হইবেন”। সংসদে তিনশ’ আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্যের পাশাপাশি ৫০ জন সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান আইনসভায় এবং রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার কথা ছিলো। অথচ, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংখ্যানুপাতে ও তাদের ভোটে এই সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের নির্বাচিত (বা মনোনীত) করার বিধানের মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়টিই সংসদের জন্যে আলংকারিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন ডাকসাইটে পুরুষ নেতার স্ত্রী বা কন্যা এবং বিভিন্ন নায়িকা-গায়িকাদের এরকম কোটা সুবিধায় সংসদ সদস্য হতে দেখা যায়।
(৫) জেণ্ডার বাইনারিঃ সংবিধানে বর্তমানে যে সরলরৈখিক লিঙ্গ কাঠামো রয়েছে, সেটি নারী পুরুষের বাইরেও অন্যান্য লিঙ্গ পরিচয়কে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করে না। বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক যেমন জাতিতে বাঙালি, তেমনি লিঙ্গে তারা কেবলই পুরুষ কিংবা নারী।
সংবিধান প্রণয়নে নারীর অংশগ্রহণ
সংবিধান যদি হয় রাষ্ট্রের সমগ্র জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও একটি রাষ্ট্রের প্রকৃতি নির্ধারণে আইনগত বন্দোবস্তের ভিত্তি, তবে বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সকলের জন্যে অন্তর্ভূক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকল্পে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে সংবিধান প্রণয়নের কাজটিতে বিভিন্ন জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম ও শ্রেণীর অন্তর্ভূক্তি বা প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। যেখানে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, সেখানে সংবিধান প্রণয়নের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে শুরু করে খসড়া লিখন ও অনুমোদন— প্রতিটি ধাপেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আবশ্যক। ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুলই ছিল, সংবিধান প্রণয়নের সময়ে জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম ও শ্রেণীর মানুষের অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করা হয়নি, খুবই অল্প সংখ্যায় যারাও ছিলেন তাদের মতের কোন গুরুত্ব সেখানে ছিল না। একই ভুল কি এবারেও করা হচ্ছে, বা হবে? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংবিধান সংস্কার কমিশন ঘোষণা করেছে, সেখানেও মাত্র একজন নারী সদস্য রয়েছেন।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ৩৪ সদস্যের কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন রাজিয়া বানু। ১৯৭২ সালের ২৭ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ওপর দেওয়া বক্তৃতায় তিনি নারী অধিকার প্রসঙ্গে বলেন, “সংবিধানে লেখা আছে যে, নারীরা সমান অধিকার ভোগ করবে; কিন্তু ধর্মের অজুহাতে, কুরআন-সুন্নাহর অজুহাতে তারা সমান অধিকার ভোগ করতে পারেন না। সুতরাং সংবিধানে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে তার উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে এবং তার দ্বারা বহু-বিবাহ, মৌখিক তালাক, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যেতে পারে।”
বলাই বাহুল্য, সেই সংবিধানে রাজিয়া বানুর এই চাওয়ার কোন প্রতিফলন ঘটেনি।
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালের গণপরিষদ সভার প্রায় ৫৫% আসনের সদস্যরা নির্বাচনের সংখ্যানুতিক হারে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মনোনীত হয়ে আসেন। নেপালের আইনানুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্ধারিত সদস্য নির্বাচনের সময়ে নারী, দলিত, নিপীড়িত সম্প্রদায়/ আদিবাসী গোষ্ঠী, অনগ্রসর অঞ্চল, মাধেসি এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করতে হয়, যেখানে কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ সদস্য নারী৩। ২০১৫ সালে গৃহীত নেপালের সংবিধানে৪ রাইট টু ইকুয়ালিটি বা সমানাধিকার শীর্ষক অনুচ্ছেদের প্রথম ধারায় “সকল নাগরিক”কে আইনের চোখে সমান ও সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারায় আইনের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হবে না ও রাষ্ট্র কোনরকম বৈষম্য করবে না বলা হয়েছে, সেখানে ধর্ম, বর্ণ, বংশ, জন্ম, লিঙ্গ (সেক্স), গোষ্ঠী, শারীরিক অবস্থা, বৈবাহিক অবস্থা, গর্ভকালীন অবস্থা, ভৌগলিক অবস্থান, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতির কারণে বৈষম্য করা হবে না। এখানে লিঙ্গভেদে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে, আমাদের সংবিধানের মত “নারীপুরুষভেদে” বৈষম্য না করার কথা বলা হয়নি। ৩য় ধারায় একইসাথে ব্যতিক্রম হিসেবে ইতিবাচক বৈষম্য করার কথা বলা হয়ছে, সেখানে কেবল নারী, শিশু ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারী, দলিত, আদিবাসী, মাধেসি, থারু, মুসলমান, নিপীড়িত শ্রেণী, অনগ্রসর সম্প্রদায়, সংখ্যালঘু, প্রান্তিক গোষ্ঠী, কৃষক, শ্রমিক, যুবক, শিশু, প্রবীণ নাগরিক, লিঙ্গীয় সংখ্যালঘু (সেক্সুয়াল মাইনরিটিস), প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী, অক্ষম এবং অসহায় ব্যক্তি, অনগ্রসর অঞ্চলের নাগরিক এবং আর্থিকভাবে বঞ্চিত নাগরিকদের সুরক্ষা, ক্ষমতায়ন বা অগ্রগতির স্বার্থে বৈষম্য করতে পারবে বলা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ৪র্থ ও ৫ম ধারায় কর্মক্ষেত্রে ও পিতামাতার সম্পত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মাঝে কোন রকম লিঙ্গীয় বৈষম্য (জেণ্ডার ডেস্ক্রিমিনেশন) থাকবে না বলা হয়েছে। এই সমানাধিকার শীর্ষক অনুচ্ছেদের বাইরে সংবিধানে “নারীর অধিকার” শীর্ষক আরেকটি অনুচ্ছেদ আছে যেখানে ৬ টি ধারায় বলা হয়েছেঃ প্রত্যেক নারী বংশগতভাবে সমান অধিকার লাভ করবে; প্রত্যেক নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অধিকার থাকবে; নারীর প্রতি শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অন্য কোনো ধরনের সহিংসতা বা ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অন্যান্য প্রথার ওপর ভিত্তি করে কোনো ধরনের নিপীড়ন চলবে না; আনুপাতিক অন্তর্ভুক্তির নীতির ভিত্তিতে সমস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সংস্থায় নারীর অংশগ্রহণের অধিকার থাকবে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ সুযোগ পাওয়ার (ইতিবাচক বৈষম্যের ভিত্তিতে) অধিকার থাকবে এবং সংসারে সম্পত্তি ও পারিবারিক বিষয়াদিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সমান অধিকার থাকবে।
এছাড়া, ২০১০-১১ সালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) তিউনিশিয়ার জেসমিন বিপ্লব বা জেসমিন বসন্তের পরে ২০১৪ সালে নির্বাচিত গণপরিষদ যে সংবিধান৫ প্রণয়ন করে, সেখানেও নারীদের অধিকার রক্ষা, সুযোগের সমতা, নির্বাচিত পরিষদে নারীর প্রতিনিধিত্বের নিশ্চয়তা এবং নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র তুরস্কের সংবিধানেও নারীর সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
সিডঅ (CEDAW) সনদ৬
রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে জাতিসংঘের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদে (সিডঅ সনদে) ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ২, ১৩(ক), ১৬(১/ক) ও ১৬(১/চ) নাম্বার ধারায় সংরক্ষণসহ অনুসমর্থন করে। পরবর্তীতে ধারা ১৩(ক) এবং ১৬(১/চ) থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হলেও ২ এবং ১৬(১/ক) ধারায় সংরক্ষণ এখনও রাখা হয়েছে। CEDAW-সনদের ২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রকে নারীদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বন্ধ করতে এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রকে এমন নারীবান্ধব সংবিধান ও আইন তৈরি করতে হবে, যা তাদের পুরুষের সমান অধিকার দেয়। এছাড়াও এই ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করতে হবে। এই ধারায় অনুসমর্থন না করার মাধ্যমে কি বাংলাদেশ কি এটাই স্বীকার করে নিচ্ছে যে, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন এখনও বিদ্যমান? একইভাবে, সিডঅ সনদের ১৬(১/ক) নম্বর ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, নারী বিয়েতে প্রবেশের ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার পান। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কি বিয়ে সম্পর্কে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার স্বীকার করে না? আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রকে নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপের আন্তর্জাতিক সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা অনুসমর্থনে কোন রকম বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
বাংলাদেশের আইন
(১) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০৭
লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের চূড়ান্ত চিত্র নারীর প্রতি সহিংসতা। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ -এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় প্রতারণামূলক সম্মতি আদায়পূর্বক যৌন সঙ্গমকে ধর্ষণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার ফলে থানাগুলোতে প্রতারণামূলক ধর্ষণ মামলার আধিক্য দেখা যায়, অন্যদিকে প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনাগুলো আড়ালে থাকে, থানাপুলিশের পূর্ণ মনোযোগ লাভে ব্যর্থ হয়। এই আইনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকলে অসম্মতিতে বা জোর করে যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ বলে বিবেচিত হয় না। নারী ব্যতীত অন্য লিঙ্গের প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্ষণও এই আইনের আওতাবহির্ভূত। যৌতুকের জন্যে কোন নারীকে যদি তার স্বামী ও স্বামীর আত্মীয়-স্বজন জখম করেন, মৃত্যু ঘটান বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করেন, সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, যৌতুক বাদেও নারীর উপরে স্বামীর বা স্বামীর আত্মীয় স্বজনের আক্রমণ, জখম, মৃত্যুর বিষয়ে কোন ধারা নেই। অথচ আমাদের দেশে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার। এক্ষেত্রে অবশ্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ রয়েছে। এই আইনে পারিবারিক সহিংসতার অপরাধকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যেখানে "পারিবারিক সম্পর্ক" অর্থ রক্ত সম্বন্ধীয় বা বৈবাহিক সম্পর্কীয় কারণে অথবা দত্তক বা যৌথ পরিবারের সদস্য হইবার কারণে প্রতিষ্ঠিত কোন সম্পর্ক। কিন্তু, এই আইনে সংঘটিত কোন অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য বলা হয়েছে, এবং অপরাধে সাজার পরিমাণও অনেক কম।
(২) সম্পত্তিতে নারীর অধিকার
আমাদের সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্যের আরেকটি ক্ষেত্র সম্পত্তিতে নারীর অধিকার। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং আদিবাসী সমাজে মেয়েরা বেশিরভাগক্ষেত্রে তাদের বাবা-মায়ের সম্পত্তির কোনো ভাগ পান না। মুসলমান মেয়েরা বাবা-মায়ের সম্পত্তির অধিকার পেলেও ভাইদের তুলনায় অর্ধেক পান। এই ধরণের লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী আইনের কারণে সমাজে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ থাকে এবং নারীর প্রতি নির্যাতনের রাস্তা প্রশস্ত হয়। অথচ তুরস্কের মতো মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রেও নারীরা সিভিল কোডের অধীনে উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আইনের মারফত নিজেদের ভাইদের সমান অংশ পেয়ে থাকেন। সম্পত্তিতে নারীকে এইভাবে ক্রমান্বয়ে বঞ্চিত করার লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী উত্তরাধিকার আইন বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ১৯ (সুযোগের সমতা) এর (১) এবং (২) সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
(৩) বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭৮
বাল্য বিবাহ সরাসরি নারীর মানবাধিকারের লঙ্ঘন। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-র মাধ্যমে বাংলাদেশে ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ এবং মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ নির্ধারণ করা হলেও “বিশেষ বিধান” এর মাধ্যমে ১৯ নম্বর ধারায় “সর্বোত্তম স্বার্থে” ১৮-এর নিচে ব্যতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়েছ। এই ধারা বলছে, “এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোন বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না।” এই বিশেষ বিধানের “বিশেষ প্রেক্ষাপট” এর কোনরকম বিবরণ, ব্যাখ্যা বা উদাহরণ আইনে উল্লেখ করা হয়নি। এক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম “অপ্রাপ্তবয়স্ক” মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়সের নির্দিষ্ট করা হয়নি, যেমনটি উল্লেখ করা হয়নি বিশেষ প্রেক্ষাপটে এই “অপ্রাপ্তবয়স্ক” নারীকে বিয়ে করবে যে পুরুষ, তার বয়সের সর্বোচ্চ সীমাও। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী “শিশু” অর্থ অনধিক ষোল বৎসর বয়সের কোন ব্যক্তি এবং এইজ অব কনসেন্টও ১৬ বছর। সেক্ষেত্রে বিশেষ বিধান মোতাবেক ১৬ বছরের কম বয়সী নারীকে বিয়ে করলে সেই দম্পতির যৌন সম্পর্ক (সম্মতি বা অসম্মতিতে) কি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে? এছাড়াও, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭-এর “বিশেষ বিধান”-এর মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিয়ের বিধান শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯, সিডঅ সনদ, শিশু আইন ২০২৩, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ - এর সাথে সাংঘর্ষিক।
(৪) সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ঃ ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন বা যেকোনো নির্যাতন জাতীয় মামলায় বিবাদীপক্ষ বা আসামীপক্ষের আইন সংশ্লিষ্টরদের মাধ্যমে নির্যাতিত নারীকে চরিত্রহননের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার নির্যাতন করা বাংলাদেশের মতো লৈঙ্গিক আধিপত্যবাদী সমাজের প্রিয় কাজ। নারীর পোশাক-কথা-চলাফেরা-তাকানো সমাজের, অর্থাৎ পুরুষের মনমতো না হলে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ এর ধারা ৫৩ এবং ধারা ১৪৬(৩) এ যুক্ত নতুন শর্তের মাধ্যমে নারীকে বেশ্যা প্রমাণ করা, নারীকে বহুগামী প্রমাণ করা, ভুক্তভোগী নারীর চরিত্র নিয়ে, তার সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে তাকে হেনস্তা করা সম্ভব। ধারা ৫৩ তে বলা হয়েছে ফৌজদারি কার্যক্রমে অভিযুক্ত ব্যক্তি, অর্থাৎ এক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আদালতের আছে। ধারা ১৪৬ (যে প্রশ্ন জেরায় বিধিসম্মত) এর (৩) এ বলা হয়েছে, “তাহার চরিত্রহানি দ্বারা তাহার বিশ্বসনীয়তায় আঘাত করিতে, যদিও ঐরূপ প্রশ্নসমূহের উত্তর তাহাকে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে অপরাধের সহিত সংসক্ত করিতে প্রবণ হইতে পারে, অথবা তাহাকে কোন দণ্ড বা বাজেয়াপ্তির সম্মুখীন করিতে পারে বা, প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে, সম্মুখীন করিতে প্রবণ হইতে পারে।” দেশের বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠনের পর্যায়ক্রমিক আন্দোলন এবং রিটের বিপরীতে ২০২২ এর সংশোধনীতে নারী অবমাননাকর, অসংবিধানিক ১৫৫(৪) ধারা তুলে নেওয়া হলেও ১৪৬(৩) এ শর্ত আরোপ করে দেওয়া হয়েছে এই বলে যে বিচারপ্রক্রিয়া এই সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করলে আদালতের অনুমতি নিয়ে ধর্ষণের শিকার বা ধর্ষণ-প্রচেষ্টার অভিযোগ আনা নারী বা ভুক্তভোগীর অতীত যৌন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে। ১৫৫(৪) ধারায় বলা হয়েছিলো, “কোনো ব্যক্তি যখন বলাৎকার বা শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপর্দ হন, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা।” ২০২২ এর সংশোধনীতে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) বাতিল হলেও ধারা ৫৩ এবং ১৪৬(৩) ধারার মতো নারীকে মানুষ হিসাবে অবমূল্যায়ন করার মতো শর্তাবলি এখনও টিকে আছে, যার মাধ্যমে এখনও নারীকে ন্যায্য বিচার পাওয়া থেকে রহিত করা সম্ভব, যা আমাদের জাতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনার সাথে সাংঘর্ষিক।
উপসংহার
জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী যে উচ্ছ্বসিত ‘নতুন’ বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, সেই ইনক্লুসিভিটি কতখানি দৃশ্যমান? অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এই আন্দোলনে মেয়েদের সম্পৃক্ততা ছিল বিরাট, এখন অনেকে ভুলে গেলেও একটা সত্য যে মেয়েরা না থাকলে এই আন্দোলন কোনোভাবেই সফল হতো না।” অথচ এই মাত্র আড়াই মাস আগের রাজপথ দখল করা, রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান দেওয়া, গ্রাফিতি আঁকা, বাংলা ব্লকেডে রাস্তা আটকোনো মেয়েরা সব কোথায় গেলেন? আন্দোলনে ছেলেদের পাশাপাশি যে মেয়েরাও শহিদ হলেন, তাদের নামও কেন হুট করে হারিয়ে যেতে থাকলো আমাদের সম্মিলিত থেকে? এইসব মৌলিক আপত্তিবাদী মস্তিষ্কসম্পন্ন রাষ্ট্র-সমাজ-মানুষ, এইসব “where have all the flowers gone” লিরিক্সরা কি আমাদের নয়া বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে না - বাংলাদেশ রাষ্ট্র, তার সংবিধান ও আইন কতখানি নারীবান্ধব? আমাদের কি জিজ্ঞেস করছে না, সংবিধান প্রণয়ন, সংস্কার কমিশনে নারীকে কতখানি যুক্ত করা হচ্ছে? বর্তমান সংবিধানের যতটুকু নারীর অধিকার সংরক্ষণ করে, তার কতটুকুই বা বাস্তবিক প্রয়োগ হচ্ছে বাংলাদেশে? আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য যে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আর স্বাধীন বিচার বিভাগ দরকার, তা গড়ে উঠেনি - এটি সবাই বলছি। কিন্তু এই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আর বিচার বিভাগ কি নারীবান্ধব, নারীর প্রতি সংবেদনশীল? আমাদের সামনে কি প্রশ্ন আসছে না - নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে সংবিধানের পরিমার্জনে আমাদের এই মুহূর্তে করণীয় কী? আমাদের কি বিয়ের বয়স, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে ও সম্পদে নারীর সমান অধিকার এবং লিঙ্গ বৈষম্যমূলক অন্যান্য আইনগুলি নিয়ে আবার ভাবতে হবে না? এই আইনগুলির কোন কোন ধারা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, কোন কোন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণা ও সনদের সাথে বিরোধপূর্ণ তা নিয়েও কি চিন্তা শুরু করতে হবে না? আমাদের কি প্রশ্ন করতে হবে না, আমরা কেন নারীর বিরুদ্ধে ঘটা সন্ত্রাস-সহিংসতা নিয়ে আইনের দুর্বলতার কথা ভাবিনি এখনো? আমরা কি নিজেদের জিজ্ঞেস করবো না - সংবিধান এবং প্রাসঙ্গিক আইনের দুর্বলতা - সমস্যা - সংকট - ঘাটতি দূরীকরণ ছাড়া, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে, মানুষ হিসেবে নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া, নারীর নিরাপত্তা ছাড়া এই অভ্যুত্থান কিভাবে সফল হবে?
আদৌ সফল হবে কি?
সূত্রঃ
১। ছয় সংস্কার কমিশনে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নেই, নারী কম। প্রথম আলো, অক্টোবর ২৪, ২০২৪। https://www.prothomalo.com/bangladesh/7gdqmv1vu9
২। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানঃ http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-957.html
৩। Guidance Note: Women’s Human Rights and National Constitutions, by UN Women (United Nations Entity for Gender Equality and the Empowerment of Women), 2012. https://peacemaker.un.org/sites/default/files/document/files/2022/07/unwomenguidancenotewomenshumanrightsandnationalconstitutions2012.pdf
৪। নেপালের সংবিধান ২০১৫ :
https://ag.gov.np/files/Constitution-of-Nepal_2072_Eng_www.moljpa.gov_.npDate-72_11_16.pdf
৫। তিউনিশিয়ার সংবিধান ২০১৪ :
https://www.constituteproject.org/constitution/Tunisia_2014
৬। সিডঅ সনদ (Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women): https://www.ohchr.org/sites/default/files/cedaw.pdf
৭। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ :
http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-835.html
৮। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ : http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-details-1207.html
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান - নারীরা সবখানে সমান তালে অংশ নিয়েছে, ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনীর হাতে ঢাকার রাস্তায় বেধড়ক মার খেয়ে রক্তাক্ত হওয়া, তারপরে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীহলগুলো থেকে নেমে পড়া, ছাত্রলীগকে হল ও ক্যাম্পাসগুলো থেকে অবাঞ্ছিত করা থেকে শুরু করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে, সারাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, সমন্বয়কদের কমিটিতে, সর্বত্র নারীর সরব উপস্থিতি ছিল। মার খেয়েছে, গুলি খেয়েছে, আহত হয়েছে, শহীদ হয়েছে। পুলিশের ভ্যানের সামনে অকুতোভয় দাঁড়িয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, রাস্তাঘাট-আবর্জনা পরিস্কার, মন্দির পাহারার কাজে যুক্ত থেকেছে। অথচ, এরপরে সেই নারীকে বিযুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। নারীর ওপরে আক্রমণও শানানো হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় নারীর পোশাক-আশাক, স্বাধীন চলাফেরায় হস্তক্ষেপ করতে দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে, বিভিন্ন কমিশনে, নারীর উপস্থিতি আনুপাতিক হারে খুবই কম বা নেই।
আমাদের সংবিধান ও আইন, তথা পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো চরম অগণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিবাদের মূল বীজ এসবের মাঝেই লুকায়িত। ঠিক তেমনি আমাদের সংবিধান, আইন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরতে পরতে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বিরাজমান। আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলই রাজনৈতিক পরিসরে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। সে জায়গা থেকেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোতে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য দূর করা দরকার। নারীকে যুক্ত করা দরকার, নারীর বক্তব্য শুনা দরকার। সে লক্ষেই আমাদের দ্বিতীয় গণতন্ত্র-ওয়েবসভার বিষয়ঃ সংবিধান, আইন ও 'নারী'।
মূল প্রবন্ধ লিখেছেন ও উপস্থাপন করছেনঃ নাদিয়া ইসলাম, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক।
আলোচনা করছেনঃ
শরমিন্দ নীলোর্মি, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
নাদিরা ইয়াসমিন, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, নরসিংদী সরকারী কলেজ এবং সম্পাদক, নারী অঙ্গন
ইসাবা শুহরাত, সংগঠক, শেকল ভাঙার পদযাত্রা
সঞ্চালনা করছেনঃ
ইশরাত জাহান ঊর্মি, সাংবাদিক