এক
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, "এক জালেম আজকে আমাকে নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষী বলেছেন। এ মিথ্যুক ফাসিক খোঁজ নিয়ে কথা বলে নাই। ইন্নাজ জন্না আকযাবুল হাদিস। অনুমান নির্ভর কথা বলে ওরা আমাদেরকে হত্যাযোগ্য করে তুলছে৷ ওরা তো বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকেই মুসলমান মনে করে না"।
এতটুকু আলাপের সবচেয়ে বিশেষ দিক হচ্ছে, মাহফুজ আলমকে কেউ "নাস্তিক ইসলামবিদ্বেষী" (ইসলামোফোব) বলার মাধ্যমে ওনাকে (বা ওনাদেরকে) হত্যাযোগ্য করে তুলা হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। অর্থাৎ, তাঁর আলাপটি এই সাক্ষ্যই দেয় যে, এদেশে যখন কাউকে "ইসলামোফোব" বা "ইসলামবিদ্বেষী" অভিধা দেওয়া হয়, তখন তাকে হত্যা করার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়! ক্ষমতাকেন্দ্রে থাকা একজন "মুসলিম" ব্যক্তিরও "ইসলামোফোব" বা "ইসলামবিদ্বেষী" ট্যাগিং-এ প্রাণ-সংশয় হয়!
দ্বিতীয় বিশেষ বিষয় হচ্ছে, তাঁকে যেই ব্যক্তি "নাস্তিক", "ইসলামবিদ্বেষী" বলেছেন, তাকে তিনি "জালেম" বলে অভিহিত করেছেন! এখানে, বিষয়টি বুঝা দরকার। জালেম আসলে কে এবং কেন? মাহফুজ আলমকে ইসলামবিদ্বেষী বলেছেন বলেই কি তিনি জালেম? নাকি, মাহফুজ আলমের মত "মুসলিম"কে ভুলভাবে ইসলামবিদ্বেষী বলার কারণে তিনি জালেম? নাকি, যারাই অন্যকে "ইসলামবিদ্বেষী" বলে ট্যাগ দেন, তারাই জালেম? শেষেরটি হওয়ার কথা নয়, কেননা মাহফুজ আলম একই পোস্টে জানিয়েছেন, "আমরা ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে"। অর্থাৎ, ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে একইভাবে যাদের ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়ান, তাদেরকে তিনি নিজেও ইসলামবদ্বেষী হিসেবেই ট্যাগ দেন! যেহেতু নিজেই অন্যকে "ইসলামবিদ্বেষী" বলে ট্যাগ দেন, সেহেতু যারা অন্যকে ইসলামবিদ্বেষী ট্যাগ দেয়, তাদেরকেই তিনি নিশ্চয়ই জাহেল-জালেম বলবেন না। ধরে নিচ্ছি, যারা কেবল অন্য "মুসলিম"কে ইসলামবিদ্বেষী বলে তারাই মাহফুজের মতে জালেম-জাহেল!
তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, মাহফুজ আলমের উপলব্ধি - ওরা (এই জালেম/ জাহেলরা) বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে মুসলমান মনে করে না! আচ্ছা, ওরা (জালেম/ জাহেলরা) বাংলাদেশের অল্পসংখ্যক যে অমুসলিম - নাস্তিক মানুষ আছে, তাদেরকে তারা তাহলে কি মনে করে? তাদেরকে মানুষ মনে করে তো?
মাহফুজ আব্দুল্লাহ তাঁর সেই পোস্টে আরো লিখেছেন, "তারা আগামী কালকে আমাদের হত্যা করে, প্রথমে শিয়াদের হত্যা করবেন, তারপর কাদিয়ানী, তারপর পীর ও পীরের মুরিদদের, তারপর গণতন্ত্রপন্থী আলেমদের, তারপর পাবলিক প্লেসে হাজির মুসলিম নারীদের, তারপর কোনভাবে তাদের 'ইসলামে'র বিরুদ্ধে যায় সবাইকে হত্যা করে দেশটা হিন্দুত্ববাদীদের বিচরণ ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলবেন। এ দেশের না ইনারা! উনারা ভিনদেশের এজেন্ট। খুবই স্পষ্ট ইনাদের মিশন"।
মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে সিরিয়ালটা দিয়ে তিনি শুরুতে নিজেদের কথা লিখে তারপরে একে একে শিয়া, কাদিয়ানী, পীর ও পীরের মুরিদদের, গণতন্ত্রপন্থী আলেমদের, পাবলিক প্লেসে হাজির মুসলিম নারীদের, কোনোভাবে তাদের 'ইসলামে'র বিরুদ্ধে যায় এমন সবাইকে হত্যা করবে বলে জানালেন; ঠিক একই রকম সিরিয়ালে "ওরা হত্যা করবে" বলে সাবধানবানী জানিয়েছিলো বাংলাদেশের নাস্তিক ব্লগাররা, যখন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে ও ইসলামবিদ্বেষী (ইসলামোফোব) অভিধা দিয়ে তাদেরকে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিলো। সে সময়ে নাস্তিকরা বলেছিলো, "আজকে আমাদেরকে হত্যা করছে, কিন্তু এখানেই তারা থামবে না! নাস্তিকদের, সমকামীদের, ট্রান্সজেণ্ডারদের হত্যা করা শেষ হলে কাল তারা কাদিয়ানিদের আর শিয়াদের হত্যা করবে, তারপর দিন ভিন্ন তরিকার মুসলিমদের হত্যা করবে। তারপরে তারা ধরবে আপনাদের মত মডারেট মুসলিমদের, যারা আজকে আমাদেরকে 'ইসলামোফোব' বলে এই হত্যাযজ্ঞের পরোক্ষ সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছেন"। সেই আমলে ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো 'মুসলিম' আজকে নিজেরাই "ইসলামবিদ্বেষী" ট্যাগিং খেয়ে যাচ্ছেন!
দুই
কত জ্ঞানী-গুনীজনের সাথে তর্ক করেছি, ভাই ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া একটা ভুল টার্ম, এটাকে এভাবে ক্রিমিনালাইজ কইরেন না, এভাবে নাস্তিকদের লাইফ থ্রেটেণ্ড কইরেন না! নাস্তিকদের মধ্যে কেউ কেউ আছে, যারা ভারতে গিয়ে বা পশ্চিমাদেশে গিয়ে - মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, সেটাকে রেসিজম-জেনোফোবিয়ার সমতুল্য গণ্য করে সেই মুসলিম-বিদ্বেষের (মুসলিমোফোবিয়ার) বিরুদ্ধে কথা বলতেই পারেন, কিন্তু এটাকে ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া বলেন না! ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নেদারল্যাণ্ডসের ফার রাইট নেতা খিয়ার্ট উইল্ডার্সকে যখন ইসলামোফোব বলা হয়, তখন তাদের গুরু পাপটাকে হালকা করা হয়! তাদের সমর্থকরা তো যুক্তিও করে এই বলে যে, যেকোনো মতবাদ বা ইজম, দর্শন, ধ্যানধারণার সমালোচনা করা, আঘাত করা জ্ঞানজগতের জরুরি একটা কাজ। প্রতিটা ধর্মের মানুষই নিজ ধর্ম বাদে অন্যসকল ধর্মের সমালোচনা করে, প্রতিটা ধর্মে বা ধর্মগ্রন্থেই তার আগে আসা ধর্মের ব্যাপারে অনেক কড়া সমালোচনা আছে। এগুলোকেও কি বিদ্বেষ বলা হবে? কোনো ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ, ধর্ম প্রবর্তক, ধর্মপুরুষ এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি সমালোচনাকে "বিদ্বেষ" বলা হলে ধর্মের প্রতি কথিত এই "বিদ্বেষ"কে খুবই স্বাভাবিক বিষয় ধরে নিতে হবে, তা নিয়ে আপত্তি করার কিছু নেই! এভাবেই বস্তুত ট্রাম্প - উইল্ডার্সের মত ঘৃণাবাদীদের ইসলামোফোব বলার কারণে তাদের আসল যে অপরাধ, তা আড়াল করা হয়! তারা বস্তুত প্রচণ্ড রকম মুসলিমবিদ্বেষী (মুসলিমোফোব)। কিছু মুসলিম জঙ্গী গোষ্ঠীর অপরাধকে জেনারালাইজ করে পুরা মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাঁধে দেয়া, মুসলিম মাইগ্রেন্টদের বিরুদ্ধে ঘৃণার চাষ করা - এটা জেনোফোবিয়া বা রেসিজম। এই কাজ ট্রাম্প - খিয়ার্ট উইল্ডার্স সহ ফার রাইটরা করছে। অথচ, ইসলামোফোব বলার কারণে তাদের জেনোফোবিয়া বা রেসিজমের মত অপরাধই আসলে ঢাকা পড়ে যায়! অর্থাৎ, এই ইসলামবিদ্বেষী টার্মটার সমস্যা দুই রকম, একদিকে যারা মুসলিমবিদ্বেষী, তাদের ভয়ানক রেসিজম টাইপের অপরাধকে লঘু করা হচ্ছে, অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে যারা ইসলামের সমালোচনা করে বা করেছে, তাদেরকে ইসলামবিদ্বেষী বা ইসলামোফোব অভিধা দিয়ে ঘৃণার পাত্র বানানো হয়, তাদের জীবন সংশয় করে তোলা হয়!
নবী-রাসুলকে ব্যঙ্গ করা, নবীর কার্টুন আঁকা, আল্লাহকে নিয়ে মশকরা করা, কোরআনের অবমাননা করা - এগুলোকে ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া বলা যাবে না কেন, এমন প্রশ্নও অনেকের। প্রথমত এসব যদি ইসলামবিদ্বেষ হয়ও, সেই ইসলামবিদ্বেষীকে শারীরিকভাবে কেউ আঘাত করতে পারে না, দরকার মনে করলে তাকে লিখে জবাব দেয়া যায়, সবচেয়ে ভালো পন্থা সম্পূর্ণ ইগনোর করে যাওয়া। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষী ট্যাগ দিয়ে তাকে ক্রিমিনালাইজ করে হত্যাযোগ্য করে তোলাটা ভয়ানক অপরাধ। দ্বিতীয়ত, শুধু নবী-আল্লাহ-কোরআনকে নিয়ে এমন ব্যঙ্গ-বিদ্রুপকেই ইসলামবিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করায় সীমিত থাকছে না, থাকবে না; ইসলামের যেকোনো সমালোচনা, এমনকি ইসলামিস্ট-সালাফিস্টদের সমালোচনাকেও ইসলামবিদ্বেষ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। স্রেফ সমকামিতা নিয়ে বই লেখার জন্যে লেখককে ইসলামবিদ্বেষী বলা হয়েছে, স্কুলে "হিন্দু" বিজ্ঞান শিক্ষককে পাঠ্য একটা বিষয়ের সাথে ইসলামের কন্ট্রাডিকশন দেখিয়ে প্রশ্ন করলে শিক্ষক বিজ্ঞানের আলাপটিকে সঠিক বলে দাবি করেছেন, সেটিকে ইসলামবিদ্বেষ হিসেবে প্রচার করে মিছিল মিটিং হয়েছে! আজকে দেখেন, মাজার ভাঙ্গার বিরোধিতা করাকে ইসলামবিদ্বেষ বলা হচ্ছে, দুদিন আগে খুলনায় "ইসলামবিদ্বেষী" অভিধা দিয়ে এক কলেজছাত্র বালককে হত্যার হাত থেকে রক্ষার চেস্টা করায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদেরও নাস্তিক, ইসলামবিদ্বেষী বলে ট্যাগ দিয়ে হামলা করা হয়েছে! তৃতীয়ত, সেই ২০১৫ সালে যেই মুহুর্তে নাস্তিকদের, সমকামীদের হত্যা করা হচ্ছিলো, ট্রান্সজেণ্ডারদের পেটানো হচ্ছিলো, সেই মুহুর্তে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাস্তিকোফোবিয়া, হোমোফোবিয়া, ট্রান্সফোবিয়া - এসবকে ক্রিমিনালাইজ করা উচিৎ ছিল (কেননা, এসবই ক্রিমিনাল অফেন্স), অথচ না! "হত্যা করা ঠিক না", "আঘাত করা ঠিক না",- এসব বলে একটা "কিন্তু" জুড়ে দিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কথিত "অপরাধ" হিসেবে "ইসলামফোবিয়া"কে সামনে আনার মাধ্যমে, ইসলামোফোবকে প্রকারান্তরে হত্যাযোগ্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে! বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে যেসব বুদ্ধিজীবী, একাডেমিক, এমনকি নৃতাত্ত্বিকরা পশ্চিমা একাডেমিয়ার অনুকরণে "ইসলামোফোবিয়া" শব্দটা ব্যবহার করেছেন, তাদের প্রত্যেকের হাতেই আসলে নাস্তিক ব্লগারদের রক্ত লেগে আছে, শুধু তাই নয় আজকেও যে "ইসলামোফোব" বা "ইসলামবিদ্বেষী" ট্যাগিং দিয়ে "সকল"কে হত্যাযজ্ঞ করা হচ্ছে, তার পেছনেও তাদের বড় দায় আছে। এই দায় থেকে দেশে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেও তাদের চেয়ে বড় উগ্রবাদী ইসলামিস্টদের কাছ থেকে ইসলামবিদ্বেষী ট্যাগ পাওয়া মাহফুজ আলম, ফরহাদ মজহাররাও মুক্ত নন।
তিন
মাহফুজ আলমের আলাপে আরেকটা ভয়ানক বিষয় আছে। নাস্তিক, শিয়া, কাদিয়ানি, ভিন্ন তরিকার মুসলিম, পাবলিক স্পেসে যাওয়া নারী - সবাইকে হত্যা করার ফলে কি হবে? তাঁর মতে এদেশটা হিন্দুত্ববাদীদের বিচরণক্ষেত্রে হবে! তিনি বলে দিচ্ছেন - এসব জালেম, জাহেলদের পরিচয় তিনি দিয়েছেন, "এ দেশের না ইনারা, উনারা ভিনদেশের এজেন্ট। খুবই স্পষ্ট ইনাদের মিশন"! এই আলাপ খুব ভয়ানক একপেশে ও রেসিস্ট আলাপ এই কারণে যে, আজকে যারা মাজার ভাঙ্গছে, যারা ইসলামোফোব ট্যাগ দিয়ে বাচ্চা কলেজছাত্রকে হত্যা করতে উদ্যত হচ্ছে - পরিস্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে তারা কারা, কী তাদের চিন্তাভাবনা, কী তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস! অথচ, এদেশের এইসব উগ্র ইসলামবাদী, সালাফিবাদীদের কথা না বলে, তাদেরকে হিন্দুত্ববাদী হিসেবে পরিচয় দেয়া, তাদেরকে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের তথা ভারতের এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করা ভয়ানক! এর মাধ্যমে বস্তুত এদেশের উগ্র ইসলামবাদ, সালাফিবাদ, ওয়াহাবিজমের প্রসার-প্রচারের বাস্তবতাটাকে আড়াল বা গোপন করা হয়, সেইসব ইসলামিস্ট, সালাফিস্ট চিন্তাচেতনাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জরুরি কাজটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়!
হ্যাঁ, এটা সম্পূর্ণভাবে ঠিক যে, বাংলাদেশে এখন এরকম ঘটনা যত ঘটবে, মানে ইসলামিস্ট - সালাফিস্ট গোষ্ঠী যত মাথাচাড়া দিবে, ততই আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা ফিরে আসার গ্রাউণ্ড পাবে, অন্যদিকে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরাও এমন জঙ্গীবাদী ইসলামকে দেখিয়ে তাদের মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতির ফায়দা তুলবে। এমনকি বাংলাদেশে উগ্রবাদী ইসলামিস্টদের উত্থানের নেপথ্যে পরাজিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তির যোগসাজেশ থাকতে পারে (আওয়ামী আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ - মিলিটারি এগুলো ঠেকানোর চেস্টা করছে না কেন? বা উসকানি দিচ্ছে কে বা কারা?)। কিন্তু যেই উন্মত্ত মানুষরা এরকম শাতিমে রাসুল ছেলেটিকে হত্যা করতে উদ্যত হচ্ছে, বা মাজার ভাঙ্গতে যাচ্ছে, যারা খুব সহজে উসকে যাচ্ছে, যারা আশিকে রাসুল হতে চাচ্ছে, যারা মাজার পূজা তুলে দিতে চাচ্ছে, তাদেরকে কি কোনোভাবেই হিন্দুত্ববাদী বা ভারতের এজেন্ট বলার উপায় আছে? এই বিষয়টিই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমল থেকে দেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা বুঝেননি। ২০২১ সালে কুমিল্লায় পুজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার সেই মন্দিরে এবং পরবর্তীতে সারাদেশে মন্দিরে ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা ও আক্রমণের পরে তারা হিন্দুত্ববাদীদের, শিবসেনা, মোদী-অমিত শাহকে দোষারোপ করে লিখেছিলেন! সেসব বুদ্ধিজীবীরাই আসলে আজকের মাহফুজদের মুখে ভাষা দিয়েছেন, যুক্তি তুলে দিয়েছেন - নিজেকে হত্যাযোগ্য হিসেবে থ্রেটেণ্ড ফিল করা পোস্টেও কথিত "জালেম" - "জাহেল"দের কোথাও "ইসলামবাদী" বলতে তো পারেননি, শেষ পর্যন্ত ভিনদেশের এজেন্ট বলেছেন, সবাইকে হত্যা করা হলে এদেশটা হিন্দুত্ববাদীদের বিচরণক্ষেত্র হয়ে যাবে - সেটাই তার মূল দুশ্চিন্তা!
একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার, ভারতের হিন্দুত্ববাদী আর বাংলাদেশে ইসলামবাদী রাজনীতি একে অপরকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে, হৃষ্টপুষ্ট হয়। বাংলাদেশের ইসলামবাদীদের দেখিয়ে ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের রাজনীতি রসদ পায়, আবার ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের আগ্রাসন এদেশে উগ্র ইসলামবাদীদের রাজনীতির গ্রাউণ্ড তৈরি করে। ফলে, আমাদের দেশে উগ্র ইসলামবাদী রাজনীতির বিরোধিতা বাদে কেবল ভারতীয় হিন্দুত্ববাদিতার বিরোধিতা করা, শেষ পর্যন্ত এদেশের ইসলামবাদী - সালাফিবাদী রাজনীতিকেই হৃষ্টপুষ্ট করে, এদেশে কেবল ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে ঘৃণাটা শেষ পর্যন্ত এদেশীয় হিন্দুদের প্রতি ঘৃণায় গিয়ে পর্যবসিত হয়! আমাদের দেশে ইসলামবাদিতার এই বিপদ সম্পর্কে সচেতন না থেকেই বিভিন্ন সময়ে হরেদরে, একতরফা ও একপেশে শুধু হিন্দুত্ববাদীদের উপরে দোষারোপ করা হয়েছে, এখনও হচ্ছে! এর ফল ভয়ানক! আওয়ামী রেজিমের সময়ে হিন্দুদের মন্দির, বাড়িঘর, দোকানপাট ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের সময়ে যখন তাণ্ডবে লিপ্ত হওয়া তৌহিদী জনতা, জুম্মা পরবর্তী মুসল্লী, বা বিভিন্ন ইসলামিস্ট গোষ্ঠীকে আড়াল করে, এমনকি আওয়ামী নেতাদের যুক্ততা ও উসকানি - রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও নির্লিপ্ততাকে ছাপিয়ে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের সামনে আনা হয়, তখন এদেশের হিন্দুদের উপরে আক্রমণ চালানো মানুষগুলোর হিন্দুবিদ্বেষকেই আরো প্রশ্রয় দেয়া হয়, উসকে দেয়া হয়।যেই লোক - "কোরআন অবমাননা করেছে, নবীকে কটুক্তি করেছে হিন্দুরা, মুসলিমদের দেশে বাস করে তাদের এতবড় সাহস" বলে অনলাইনে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ালো, হামলা- আক্রমণের পরে, সেই লোকের মাঝে কোন অনুতাপ দেখা যায় না, বরং ফরহাদ মাজহার, পিনাকীর পোস্ট শেয়ার দিয়ে জানায় - এরকম হামলা আক্রমণ হচ্ছে "মোদী-অমিত শাহ ও আদিত্যনাথের মুসলমান নিধন ও ইসলাম নির্মূল রাজনীতির ফাঁদ" বা "ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায় কিন্তু পরিকল্পনা দিল্লিতে", "আমাদের দেশে র এর হয়ে কাজ করে এমন অনেক গ্রুপ আছে", বা পারভেজ আলম - রোমেলের পোস্ট শেয়ার দিয়ে বলে, "বাঙালি মুসলমানরা হইল বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান সংখ্যালঘু ও মজলুম জনগোষ্ঠী", বা "আমরা ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মতো ভিসিয়াস ইডিয়টদের উৎপাদিত ডিসকোর্সের হাতেই মার খেয়ে ভুত হয়ে যাচ্ছি" বা "বাংলাদেশে যারাই, যেকোনো উছিলায় মন্দির বা মণ্ডপে হামলা করবে, তারাই আসলে বিজেপি তথা হিন্দুত্ববাদী সৈনিকের হয়ে কাজ করবে । সেটা মুখে সে নিজেকে যত তৌহিদী জনতা বা মুসলমান বলেই প্রচার করুক না কেন"! ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির থ্রেটকে আমি অস্বীকার করি না, তার বিরুদ্ধে কথা বলার প্রয়োজন আমি দেখি, কিন্তু যেই মুহুর্তে এদেশের সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত, সেই মুহুর্তে যদি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলমানকে মজলুম বলে, এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর লাগাতর "সংখ্যালঘু নিপীড়ন" এর মুহুর্তে বাঙালি মুসলমানকেই "সংখ্যালঘু ও মজলুম" দাবি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের মজলুম হিন্দুদের ওপরে নিপীড়ন-অত্যাচারকে অস্বীকার করা হয়, তৌহিদী জনতা সহ এদেশের ইসলামবাদী গোষ্ঠীগুলোর ঘৃণাবাদী কর্মকাণ্ডগুলোকে শুধু অস্বীকার করাই নয়, তাদেরকে হিন্দুত্ববাদী বানিয়ে দেয়া হয়, তাহলে এসবই এদেশের হিন্দুফোব, ট্রান্সফোব, হোমোফোব, নাস্তিকোফোব ইসলামবাদী রাজনীতির জমিনকেই বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে!
হিন্দুত্ববাদ নিয়ে কথা বললে এদেশের ইসলামবাদ নিয়েও কথা বলতে হবে। মুসলিমোফোবিয়ার বিরুদ্ধে কথা বললে (ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে না) একই সাথে হিন্দুফোবিয়ার বিরুদ্ধে (হিন্দুইজমফোবিয়ার বিরুদ্ধে না), নাস্তিকোফোবিয়ার বিরুদ্ধে, হোমোফোবিয়ার বিরুদ্ধে, ট্রান্সফোবিয়ার বিরুদ্ধেও সমান কথা বলা আবশ্যক!

.jpg&w=3840&q=75)

